ডারউইনে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে বিধ্বস্ত করে স্মরণীয় জয়

ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরিতেও শেষ রক্ষা হলো না অস্ট্রেলিয়ার। মিরাজের পাঁচ উইকেট ও হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিল বাংলাদেশ।

আরিফুল ইসলামরিপোর্টার
Published
16 Aug 2026, 14:48
Updated
16 Aug 2026, 14:48
Reading time
3 min
ডারউইনে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে বিধ্বস্ত করে স্মরণীয় জয়
খেলা · ছবি: বাংলাদেশ আজকাল

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে লেখা হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন এক অধ্যায়। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে তাদের মাটিতে স্মরণীয় টেস্ট জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষ হয়েছে এক দিনেরও বেশি সময় হাতে রেখেই। বাংলাদেশের বিপক্ষে ইনিংস হার এড়াতে পেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিনের লড়াকু সেঞ্চুরি স্বাগতিকদের সেই স্বস্তিটুকু এনে দিলেও ম্যাচ বাঁচানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। ২০১৭ সালে মিরপুরে প্রথমবার টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই এলো আরেকটি স্মরণীয় সাফল্য। দীর্ঘ ২৩ বছর পর দেশটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনও তাই হয়ে থাকল ঐতিহাসিক। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়েন গ্রিন। দলের ২৮৪ রানের মধ্যে তাঁর ব্যাট থেকেই আসে ১০৪ রান। কিন্তু অন্য প্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় স্বাগতিকরা বড় লিড গড়তে পারেনি। চতুর্থ দিনের উইকেটের সুবিধা দারুণভাবে কাজে লাগান মেহেদী হাসান মিরাজ। টার্ন ও বাউন্সে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের চাপে রেখে একে একে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন তিনি। মিরাজের ঘূর্ণিতে ফেরেন অ্যালেক্স ক্যারি, বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নসহ অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানরা। শেষ পর্যন্ত ৬৬ রান খরচায় পাঁচ উইকেট নিয়ে ইনিংস শেষ করেন বাংলাদেশের এই অফ স্পিনার। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তাঁর ১৫তম পাঁচ উইকেট শিকার। নিজের বোলিং পরিকল্পনা নিয়ে মিরাজ জানিয়েছেন, তিনি উইকেটের জন্য অতিরিক্ত কিছু করার চেষ্টা করেননি। অফ স্টাম্পের বাইরের ফুটমার্ক কাজে লাগিয়ে ধারাবাহিকভাবে সঠিক জায়গায় বল করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এমন উইকেটে শৃঙ্খলা ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের সাফল্যে ভূমিকা রাখেন। সেঞ্চুরি করা গ্রিনকে ফিরিয়ে দেন এই পেসার। দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৯টি উইকেট যায় হাসানের ঝুলিতে। দিনের শুরুতে অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার হাতে ছিল ছয় উইকেট। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৪২৬ রান থেকে তখন তারা ৬৭ রান পিছিয়ে। কিন্তু সকালের সেশনেই বাংলাদেশের বোলাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে নেন। প্রথম সেশনে তিনটি উইকেট তুলে নেন মিরাজ। এর মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া ইনিংস হার এড়িয়ে লাঞ্চে যায় ৭ উইকেটে ২৪৩ রান নিয়ে। তখন তাদের লিড ছিল মাত্র ১৫ রান। লাঞ্চের পরও বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি স্বাগতিকদের ইনিংস। ১১.১ ওভারের মধ্যেই গ্রিনসহ বাকি ব্যাটসম্যানদের ফিরিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হন। তবে এরপর আর কোনো সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশ। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক দ্বিতীয় উইকেটে অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে পৌঁছে দেন ঐতিহাসিক জয়ের বন্দরে। সাদমান ২৫ এবং মুমিনুল ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। বো ওয়েবস্টারের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট অঞ্চল দিয়ে বাউন্ডারি মেরে বাংলাদেশের জয়সূচক রানটি করেন মুমিনুল। জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় মারারা স্টেডিয়ামের আবহ। গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশি সমর্থকদের কণ্ঠে ওঠে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ ধ্বনি। মাঠে ও ড্রেসিংরুমের সামনে উচ্ছ্বাসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। অন্যদিকে স্বাগতিক শিবিরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। ডারউইনের এই জয় শুধু আরেকটি টেস্ট জয় নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামর্থ্য জানান দেওয়ার এক স্মরণীয় অধ্যায়। মিরাজের ঘূর্ণি, হাসানের পেস এবং ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তায় গড়া এই ৯ উইকেটের জয় বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেবে।

আরিফুল ইসলাম
রিপোর্টার